Bedtime Story

সিনবাদের প্রথম সমুদ্রযাত্রা: এক অজানার সন্ধানে

 

অনেক অনেক বছর আগে, ইরাকের সুন্দর শহর বসরাতে সিনবাদ নামে এক সাহসী যুবক বাস করত। তার বাবা ছিলেন একজন ধনী বণিক, যিনি সারা জীবন প্রচুর পরিশ্রম করে অনেক ধন-সম্পদ জমিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সেই সব সম্পদের মালিক হলো সিনবাদ। তরুণ সিনবাদ প্রথমে ভাবত, জীবন মানেই তো আরাম আর আয়েশ। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে হলো, এভাবে ঘরে বসে থাকা মানেই জীবন নয়। সে অস্থির হয়ে উঠল পৃথিবীর নতুন নতুন দেশ দেখার জন্য। তার মনে জেগে উঠল অজানাকে জানার এক তীব্র নেশা।

সিনবাদ তার বাবার রেখে যাওয়া কিছু সম্পদ বিক্রি করে দিল এবং সেই টাকা দিয়ে কিনল প্রচুর মূল্যবান পসরা—দামী রেশমি কাপড়, সুগন্ধি মশলা, নীল কুঠ আর কত কী! এরপর সে ঠিক করল, সে সমুদ্রে পাড়ি জমাবে। সে বসরা বন্দরে গিয়ে এক বিশাল কাঠের জাহাজ ভাড়া করল। জাহাজের নাবিকেরা ছিল খুব অভিজ্ঞ। একদিন সকালে, যখন ভোরের সূর্য সমুদ্রের জলকে সোনার মতো চকচকে করে তুলেছে, সিনবাদের জাহাজ নোঙর তুলল। পালগুলো বাতাসে ফুলে উঠল, আর জাহাজটি ধীরে ধীরে বন্দরের কোলাহল ছেড়ে অসীম সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলল।

সেই যাত্রা ছিল এক রূপকথার মতো। সিনবাদ দেখল সমুদ্র কখনো নীল, কখনো গাঢ় সবুজ। দিনের বেলা নীল আকাশ আর সাদা মেঘের খেলা, আর রাতে বিশাল আকাশের নিচে ঝিকিমিকি করা লক্ষ কোটি তারা—সিনবাদ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। নাবিকেরা তাকে শোনাত সমুদ্রের গভীরের অদ্ভুত সব প্রাণীর গল্প। তারা প্রতিদিন নতুন নতুন দ্বীপের পাশ দিয়ে যেত। সমুদ্রের নোনা বাতাসের গন্ধ আর জাহাজের কাঠের ওপর ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার ছন্দ সিনবাদকে এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল।

যাত্রার কয়েকদিন পর, নাবিকেরা চিৎকার করে উঠল, “ঐ দেখুন! সামনে একটা সবুজ দ্বীপ!”

দ্বীপটি ছিল সত্যিই চমৎকার। দ্বীপের গাছগুলো এত সবুজ যে চোখ জুড়িয়ে যায়। সেখানে ফুটে ছিল কত না রঙের ফুল, আর গাছের ডালে ডালে পাখিগুলো গান গাইছিল। সিনবাদ আর নাবিকেরা জাহাজ থেকে ছোট নৌকায় করে তীরে নামলেন। তারা কয়েক মাস জাহাজে বন্দি থাকার পর ডাঙা পেয়ে খুব খুশি হলো। কেউ দৌড়ে গেল কাঠ কুড়োতে, কেউবা বসল আগুন জ্বালাতে, আর কেউ রান্না করতে লাগল সুস্বাদু খাবার। সিনবাদ দ্বীপের ভেতর একটু হাঁটাহাঁটি করলেন। দ্বীপটা ছিল যেন স্বপ্নের মতো শান্ত।

হঠাৎ, দ্বীপের মাটি একটু কেঁপে উঠল!

সিনবাদ ভাবলেন, হয়তো ভূমিকম্প হচ্ছে। কিন্তু কম্পন থামল না, বরং বাড়তে লাগল। মাটি যেন দুলছিল! রান্না করতে থাকা নাবিকেরা চিৎকার করে উঠল, “সবাই দৌড়াও! এটা দ্বীপ নয়! এটা কোনো দৈত্য!”

সিনবাদ হতভম্ব হয়ে দেখলেন, তারা যাকে দ্বীপ ভেবে আগুনের চুলা বানিয়েছিল, সেটি আসলে বিশাল এক সামুদ্রিক তিমি মাছের পিঠ! সেই তিমিটি বছরের পর বছর জলের ওপর স্থির ছিল, আর তার পিঠে পলি জমে জমে মাটি আর গাছপালা জন্মেছিল। আগুনের তাপে তিমিটি জেগে উঠেছে! তিমিটি বিশাল এক আওয়াজ করে নড়াচড়া শুরু করল। তার নড়াচড়ায় সমুদ্রের জল উত্তাল হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সব উলটপালট হয়ে গেল। তিমির শরীর থেকে গাছপালা সব ধসে পড়তে লাগল আর বিশাল বিশাল ঢেউ জাহাজের নাবিকদের সব কিছু লন্ডভন্ড করে দিল। তিমিটি ডাইভ দিয়ে জলের গভীরে চলে গেল।

সিনবাদ জলের মধ্যে পড়ে গেলেন। তার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে এল। তিনি ভাবলেন, আজই হয়তো তার শেষ দিন। কিন্তু হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি বড় কাঠের পিপা (যা জাহাজের মালবাহী ছিল) জলের ওপর ভাসছে। সিনবাদ কোনোমতে সাঁতরে গিয়ে সেই পিপাটিকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি সারা রাত আর সারা দিন জলের ওপর ভেসে রইলেন। একদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ করছে, অন্যদিকে অসীম সমুদ্রের ভয়—সিনবাদ কোনোমতে পিপাটি কামড়ে ধরে প্রাণ বাঁচিয়ে রাখলেন।

পরদিন সকালে, যখন সূর্য উঠল, সিনবাদ দেখলেন তিনি এক পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছেছেন। কোনোমতে বালির ওপর উঠে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন না এটা কোথায়, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন—এটাই বড় কথা।

কিছুক্ষণ পর, তিনি দেখলেন কিছু মানুষ ঘোড়া নিয়ে সেখানে টহল দিচ্ছে। তারা সিনবাদকে দেখে অবাক হয়ে গেল। তারা সিনবাদকে নিয়ে গেল তাদের রাজার কাছে। সেই রাজা ছিলেন খুব দয়ালু। তিনি সিনবাদের সাহসের গল্প শুনে মুগ্ধ হলেন। রাজা তাকে অনেক সম্মান দিলেন এবং নিজের রাজদরবারে কাজ দিলেন। সিনবাদ সেই দ্বীপে বেশ কিছুদিন থাকলেন, অনেক কিছু শিখলেন, আর প্রচুর ধন-সম্পদও অর্জন করলেন।

কিন্তু সিনবাদের মন পড়ে ছিল তার নিজের দেশে, বসরার সেই বন্দরে। অনেক দিন পর, এক ব্যবসায়ীর জাহাজে করে তিনি আবার সমুদ্রপথে রওনা হলেন। অনেক ঝড়ের মোকাবিলা করে, অনেক বিপদের পথ পেরিয়ে, একদিন সিনবাদ তার সেই প্রিয় বসরার বন্দরে আবার ফিরে এলেন। তার হাতে তখন প্রচুর অর্থ, আর তার ঝুলিতে জমা হয়েছে সারা জীবনের সেরা রোমাঞ্চকর সব অভিজ্ঞতার গল্প। সেই রাতেই তিনি তার বন্ধুদের ডেকে শোনালেন—কীভাবে এক বিশাল তিমির পিঠ থেকে তিনি জীবন বাঁচিয়ে ফিরে এসেছেন।