বাবুর সহজাত শেখার ক্ষমতা
দীপ্তির অভ্যাস প্রতিদিন কিছুক্ষণ বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আর টবের গাছগুলো দেখা। তার মা প্রতিদিন গাছে পানি দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে, দুপুরে টবগুলো ছায়ায় নিয়ে আসে, আবার বিকালে রোদে। দীপ্তি সবই খেয়াল করে।
একদিন দীপ্তির এক আত্মীয় তাকে পপুলার ড্যান্সিং ক্যাকটাস উপহার দেয়। দীপ্তি সেটা পেয়ে খুবই খুশি। কিন্তু দিনকয়েক পর সেটার ব্যাটারি শেষ হয়ে যায়।
পরদিন দীপ্তির মা ক্যাকটাসটা হঠাৎ বারান্দায় টবগুলোর পাশে দেখতে পায়। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে সে অন্য কাজে মন দেয়। দুপুরে গাছগুলো ছায়ায় সরাতে এসে দেখে সেই জায়গায় ড্যান্সিং ক্যাকটাসটা রাখা, আর তার উপর পানি ছড়ানো। দীপ্তির মা বুঝলো এটা কার কাজ। সে দীপ্তিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো কেন সে এটা করেছে।
এরপর দীপ্তির উত্তর শুনে সে তব্দা খেলো। দীপ্তি বললো, “আমার ক্যাকটাসটার খাবার শেষ, তাই এখন চলছে না। ক্যাকটাসটা রোদ আর পানি দিয়ে খাবার বানাবে।” এরপর দীপ্তির মা জানতে চাইলো দীপ্তি এটা কোথা থেকে শিখেছে।
দীপ্তি বললো, “ফুপু একদিন বই পড়ছিল, তখন তাকে বলতে শুনেছি।”
সব মা-বাবারই দীপ্তির এই ‘ফুপুর টেক্সটবুকের সাথে মায়ের গাছের যত্ন রিলেট করতে পারা’-র মতো ঘটনার অভিজ্ঞতা আছে। জন্ম থেকে প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত, বাবুর ব্রেইন তার চারপাশ থেকে খুব সহজে এবং দ্রুত তথ্য আহরণ করে। এই সময়ে বাবুর ব্রেইনে প্রায় ১০ লক্ষ নিউরাল কানেকশন ঘটে।
ড. মারিয়া মন্টেসরি বাবুদের এই অসাধারণ সহজাত শেখার ক্ষমতাকে বলেছেন “বিশোষক মন” (Absorbent Mind)।
ড. মন্টেসরি এই বয়সী বাবুদের ব্রেইনকে স্পঞ্জের সাথে তুলনা করেছেন, বাবুদের ব্রেইন এসময় স্পঞ্জের মতো চারপাশ থেকে অভিজ্ঞতা শুষে নিতে থাকে।
মা-বাবার বিশোষক মন বোঝা খুবই জরুরী। বাবুর প্রথম কয়েকবছর যে অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশের সংস্পর্শে আসে, তা তাদের ভবিষ্যতের শেখা, আচরণ, এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। ইতিবাচক মেলামেশা এবং উদ্দীপক পরিবেশ তাদের কৌতূহল, স্বাধীনতা, এবং শেখার প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ড. মন্টেসরি এই সময়কালকে দুইটি ধাপে ভাগ করেছেন:
- অসচেতন ধাপ (০-৩ বছর):
এই পর্যায়ে বাবুরা প্যাসিভলি তথ্য শোষণ করে। তারা বসতে, দাঁড়াতে, হাঁটতে, এবং কথা বলতে শেখে, চারপাশের লোকদের পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণ (Mimic) করার মাধ্যমে, কোনো সচেতন চেষ্টা ছাড়াই। - সচেতন ধাপ (৩-৬ বছর):
বাবুদের আড়াই-তিনবছর বয়স হতে তারা তাদের পরিবেশের সাথে আরও সচেতনভাবে যুক্ত হতে শুরু করে। তারা অভিজ্ঞতা খোঁজে, এটা-ওটা ধরে, প্রশ্ন করে করে সবার নাভিশ্বাস উঠায়, এবং আগে অর্জিত দক্ষতাগুলো সংস্কার করে।
আসুন জেনে নিই বাবুর বিশোষক মনের পরিচয়:
- ড. মন্টেসরি জন্ম থেকে প্রায় ছয় বছর পর্যন্ত বাবুদের ব্রেইনকে স্পঞ্জের সাথে তুলনা করেছেন। বাবুদের ব্রেইন এসময় স্পঞ্জের মতো চারপাশ থেকে অভিজ্ঞতা শুষে নিতে থাকে। এর নাম দিয়েছেন “বিশোষক মন” (Absorbent Mind)।
- প্রথম কয়েক বছরে বাবুর ব্রেইনে প্রায় ১ হাজার ট্রিলিয়ন নিউরাল কানেকশন ঘটে। এরপর সিন্যাপ্টিক প্রুনিং-এর মাধ্যমে ২০ বছরে এটা ৩০০ ট্রিলিয়নে নেমে আসে।
- বাবুর বিশোষক মন (Absorbent Mind) কাজে লাগাতে আপনাকে সচেতনভাবে কিছু কৌশল অনুসরণ করতে হবে।
- ঘরের ভেতর একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং আকর্ষণীয় Yes Space তৈরি করুন যেখানে বাবু এক্সপ্লোর করতে এবং শিখতে পারে। খেলনা এবং অন্যান্য সামগ্রী নিচু তাকে রাখুন, যেন সে নিজেই সেগুলো নিতে পারে।
- আপনার সন্তানকে তাদের চারপাশ পর্যবেক্ষণ এবং আবিষ্কার করার স্বাধীনতা দিন। কাপড় নোংরা হওয়া, ফ্লোর ময়লা হওয়া– এগুলো নিয়ে বেশি ভাববেন না। এসব কর্মকান্ড বাবুর মোটর স্কিল, শেখার আগ্রহ আর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।
- বাবুর সাথে নিয়মিত কথা বলুন, সব প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করুন, বই বাবুর সামনে রেখে পড়ে শোনান, এবং নতুন শব্দ শেখান। এতে বাবুর ভাষার দক্ষতা বাড়বে এবং আপনার সাথে সম্পর্ক গভীর করে তুলবে।
- বাবু অনুকরণের মাধ্যমে শেখে। বাবুর সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন, এমন আচরণ দেখান যা আপনি বাবুর মধ্যে দেখতে চান, যেমন—উদারতা, ধৈর্য, এবং সম্মান।
- বাবুর খাবার, খেলা এবং ঘুমের রুটিন করুন, এবং প্রথম দিকে নিজেও সে অনুযায়ী চলুন। এতে বাবুর মধ্যে নিয়মানুবর্তিতার অভ্যাস গড়ে উঠবে।
- আপনার বাবুর বিশোষক মন নিয়ে কোনো ঘটনা বলুন।